মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় যেন এখন এক ব্যক্তির কাছে জিম্মি। তিনি হলেন অফিস সহকারী কাম নাজির মোঃ জাহাঙ্গীর আলম। দীর্ঘ ৯ বছর ধরে একই উপজেলায় কর্মরত থেকে তিনি গড়ে তুলেছেন দুর্নীতির এক বিশাল সাম্রাজ্য। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি এবং প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, হাট-বাজার ইজারা ও সরকারি প্রকল্প থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের কাছে তিনি এখন ‘মহম্মদপুরের অঘোষিত সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় উত্থান ও বদলি নাটক
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৪ সালে মহম্মদপুর উপজেলায় যোগদানের পর থেকেই জাহাঙ্গীর আলম তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী শ্রী বীরেন শিকদার এবং তার ভাই ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বিমল শিকদারের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। তাদের প্রশ্রয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠলে তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) তাকে অনিয়মের দায়ে মাগুরা ডিসি অফিসের সংস্থাপন শাখায় ক্লোজ করেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক এপিডি শায়লা ফারজানার তদ্বিরে দুই লক্ষ টাকা ঘুষের বিনিময়ে পুনরায় মহম্মদপুরে ফিরে আসেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, পলাতক পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামের স্ত্রীর প্রভাবে তিনি প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেন।
নিয়োগ বাণিজ্য ও কমিশনের মহোৎসব
জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গ্রাম পুলিশ নিয়োগ নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ২৬ জন গ্রাম পুলিশ নিয়োগ দিয়ে জনপ্রতি ১ লক্ষ টাকা করে মোট ২৬ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া এলজিইডি অফিসের ঠিকাদারদের বিল পাস ও ফাইল ছাড় করানোর জন্য ৩ শতাংশ কমিশন এবং ফাইল প্রতি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা ঘুস নিতেন তিনি। বর্তমান ও প্রাক্তন ইউএনওদের ‘দালাল’ হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীর ঠিকাদারদের জিম্মি করে ব্যক্তিগত অর্থবিত্ত গড়ে তুলেছেন।
হাট-বাজার ও জলমহাল ইজারা কেলেঙ্কারি
উপজেলার ৩২টি হাট-বাজার ও জলমহাল ইজারা নিয়ে চলছে জাহাঙ্গীরের একচ্ছত্র আধিপত্য। বাংলা ১৪৩১ সনে সাবেক মন্ত্রী বীরেন শিকদারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং ৪ আগস্টের মামলার আসামি সুজন শিকদারকে ১৮টি বড় হাট ইজারা দিলেও তার কাছ থেকে কোনো সরকারি রাজস্ব আদায় করেননি জাহাঙ্গীর। এছাড়া ইউএনও শাহীনুর আক্তারের সাথে যোগসাজশে হাট-বাজার উন্নয়নের ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে স্পষ্ট। মাছ চাষের জন্য নির্ধারিত রাজবাড়ির পুকুর ও পরিষদের পুকুর থেকে ১৫ লক্ষ টাকার মাছ বিক্রি করে সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে তিনি নিজেই আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ হরিলুট
উপজেলা পরিষদের এডিপি (ADP) এবং স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের ১ শতাংশ (১%) অর্থ দিয়েও জাহাঙ্গীর গড়ে তুলেছেন দুর্নীতির খনি। ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রায় ২ কোটি টাকার বরাদ্দ থেকে সেলাই মেশিন, ফুটবল ও স্প্রে মেশিন ক্রয়ের নামে কোনো মালামাল না কিনেই পুরো টাকা ভুয়া মাস্টার রোলের মাধ্যমে পকেটে পুরেছেন তিনি। এমনকি উপজেলা পরিষদের গেট ও প্রাচীর নির্মাণ প্রকল্পের ২৫ লক্ষ টাকাও পিপিআর নীতিমালা তোয়াক্কা না করে আত্মসাৎ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের শুরুতেই সব বরাদ্দ তুলে নিয়ে তিনি লোপাট করেছেন বলে জানা গেছে।
রাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান ও তথ্য পাচার
৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর জাহাঙ্গীর আলমের অবস্থান নিয়ে জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি প্রকাশ্যে বলে বেড়ান, ‘ছাত্ররা ৩ হাজার পুলিশ মেরেছে’। আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে তার পরিবার দীর্ঘকাল রাজনীতিতে যুক্ত। তার বাবা ছোনপুর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়মিত সরকারি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তার পলাতক রাজনৈতিক গুরুদের কাছে পাচার করছেন।
অঢেল অবৈধ সম্পদ
এক সময় যার পিতার সম্পদ বলতে তেমন কিছুই ছিল না, সেই জাহাঙ্গীর আলম আজ কোটিপতি। মাগুরা সদরের সোনপুর ও শাওলাডাঙ্গা মৌজায় তিনি ৩০ একরের বেশি জমি কিনেছেন বাবা-মায়ের নামে। মাগুরা শহরের তাঁতীপাড়া ও পাল্লা পূর্বপাড়ায় নির্মাণ করেছেন দুটি ৬ তলা বিশিষ্ট আলিশান ভবন। স্থানীয়রা জানান, তার বাবার দৃশ্যমান কোনো আয় নেই, অথচ ছেলের দুর্নীতির টাকায় আজ তিনি বিশাল ভূ-সম্পত্তির মালিক।
নিজস্ব প্রতিবেদক, মহম্মদপুর (মাগুরা) মহম্মদপুর উপজেলার সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিকরা এই দুর্নীতিবাজ কর্মচারীর হাত থেকে মুক্তি চায়। তাদের দাবি, জাহাঙ্গীর আলমের মতো অসাধু কর্মকর্তা প্রশাসনে থাকলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার বাধাগ্রস্ত হবে। অবিলম্বে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাকে মহম্মদপুর থেকে শাস্তিমূলক বদলি করার জন্য এলাকাবাসী প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
এ বিষয়ে নাজির জাহাঙ্গীর আলমের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে জেলা প্রশাসনের সূত্র জানিয়েছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সম্পাদকীয় কার্যালয় : ১২০/এ মতিঝিল, সি/এ আর এস ভবন, ৩য় তলা, স্যুট-৪০২, ঢাকা-১০০০ / Office : Dhaka,Bngkadesh. Mobile : 01819885817, Email : digontodhara@gmail.com