
বিশেষ প্রতিনিধি | অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | মিরপুর, ঢাকা
রাজধানীর মিরপুর পল্লবী এলাকার মিল্লাত ক্যাম্প বর্তমানে মাদক ব্যবসার এক ভয়ঙ্কর দুর্গে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষের চলাচলের আড়ালে গড়ে উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ মাদক চক্রের অবাধ সাম্রাজ্য।
এই ক্যাম্পের সবচেয়ে আলোচিত ও দুর্ধর্ষ এলাকা হিসেবে পরিচিত ‘কেচি গেইট’—যেটি মাদক ব্যবসার মূল হাব, সেখানে দিনে দুপুরে প্রকাশ্যেই চলে মাদক কেনাবেচা, যেন এটি কোনো সাধারণ ঘটনা। কেচি গেইট এবং আশপাশের এলাকা ঘিরে একে একে বিস্তৃত হয়েছে পুরো ক্যাম্পজুড়ে মাদকের নেটওয়ার্ক, যেখানে প্রতিদিন মাদক পৌঁছায়, বিলি হয় এবং ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের তরুণ ও কিশোরদের হাতে।
অনুসন্ধান করে জানা গেছে, এই ভয়ঙ্কর চক্রের পেছনে রয়েছে সাতজন মাদক ব্যবসায়ী—যারা হলো রিপা, পৃথিবী, রেশমা, দীপা, ডলার, ঘাটিয়া রাজু এবং মুস্তাকের ছেলে সুমন। তাদের প্রত্যেকের আছে নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ এলাকা, কেউ কেচি গেইট নিয়ন্ত্রণ করে, কেউ মসজিদ গলি, কেউ বাজারের পাশের এলাকা, আবার কেউ ভেতরের নির্জন জায়গাগুলো। তারা সবাই নিজেদের আলাদা ‘সেক্টর’ ভাগ করে মিল্লাত ক্যাম্পের প্রায় প্রতিটি অংশ দখলে নিয়েছে, এবং দীর্ঘদিন ধরেই প্রকাশ্যে, কোনো ধরনের ভয় বা বাঁধা ছাড়াই পরিচালনা করছে মাদকের এই ভয়াবহ রমরমা ব্যবসা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তারা প্রশাসনের নিরবতায় অতিরিক্ত সাহস পেয়েছে—মাঝে মাঝে লোক দেখানো কিছু অভিযান হলেও, তা টিকে না, কারণ অভিযানের কিছুদিন পরই আবারও চক্রের সদস্যরা আগের মতোই সক্রিয় হয়ে পড়ে। প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্য বা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা ব্যক্তিদের সহযোগিতায় এই চক্র বহুদিন ধরেই আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলছে। তারা কিশোর ও তরুণদের সহজেই প্রলুব্ধ করে মাদক বহনে ব্যবহার করছে, বিশেষ করে স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের টার্গেট করা হয়, যাদের হাতে খুব সহজেই পৌঁছে যায় ইয়াবা, গাঁজা, আইস ও ফেন্সিডিল।
এই চক্র শুধু মাদক বিক্রিই করে না, বরং এলাকায় ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে রাখে যাতে কেউ প্রতিবাদ করতে না পারে। যারা প্রতিবাদ করে, তাদের হয় ভয় দেখানো হয়, না হয় সরাসরি মারধর বা হামলার শিকার হতে হয়—এমনকি বেশ কয়েকজন স্থানীয়কে এলাকা ছাড়তেও বাধ্য করেছে তারা। ক্যাম্পজুড়ে পরিবারগুলো আজ অসহায়, কেউ মুখ খুলতে পারে না, অথচ চারপাশে ছেলে-মেয়েরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, কিশোরদের মুখে স্কুল ব্যাগের বদলে জায়গা নিচ্ছে মাদকের প্যাকেট।
এলাকার অভিভাবকরা এখন সন্তানদের স্কুলে পাঠাতেও ভয় পান, কারণ জানেন না কখন কে কোন পথে বিপথে পা বাড়ায়। শুধু তাই নয়, এই মাদকচক্রের প্রভাবে ক্যাম্পজুড়ে বেড়েছে চুরি, ছিনতাই, পারিবারিক কলহ, এমনকি খুনোখুনিও। এলাকার একাধিক নারীও এই চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে, যারা মাদকের খুচরা বিক্রয় করে থাকে নির্দিষ্ট জায়গায় বসে, আবার কেউ ঘরে বসেই চালান নিয়ন্ত্রণ করে। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে যে, মিল্লাত ক্যাম্পের নাম এখন মিরপুরজুড়ে আতঙ্কের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় ব্যবসায়ী জানান, “দোকান চালাই, কিন্তু কখন কী হয় ভয়ে থাকি। তাদের কাউকে কিছু বললে দোকান ঘরে ঢুকে মারধর করে। নিজের চোখে দেখেছি।” এক বাসিন্দা বলেন, “আমার ছোট ভাইকে ভয় দেখিয়ে মাদক টানানো শুরু করে দিয়েছে, এখন কিছু বললে আমাকে জানে মেরে ফেলবে বলে হুমকি দেয়। পুলিশে বলেছি, কেউ আসে না।” আরেকজন গৃহবধূ বলেন, “ছেলেমেয়েদের ঘর থেকে বের করতেও ভয় লাগে। কিচ্ছু বলতে পারি না, সবাই জানে কারা করছে, কিন্তু মুখ খুললেই বিপদ।”
প্রশাসনের আশ্বাস ও অভিযান আসলেও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় চক্রটির প্রভাব দিন দিন আরও বেড়েই চলেছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এই চক্র ভেঙে দিতে হলে শুধু পুলিশের অভিযান নয়, বরং সমন্বিত পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক শক্ত পদক্ষেপ প্রয়োজন, তা না হলে মিল্লাত ক্যাম্প একদিন পুরো মিরপুর অঞ্চলের জন্যই বড় একটি সংকট তৈরি করবে।
এখনই যদি এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে এই চক্রের মরণছায়া ছড়িয়ে পড়বে মিরপুর ছাড়িয়ে আরও বহু এলাকায়, আর মাদকের ভয়াবহ গ্রাসে ধ্বংস হয়ে যাবে একের পর এক তরুণ প্রজন্ম।
🎙️ ভিডিও রিপোর্ট আসছে শিগগিরই…