
গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটেছে দীর্ঘ ১৫ বছরের আওয়ামী স্বৈরশাসনের। দেশ মুক্ত হওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নিপীড়ন ও মিথ্যা মামলার বেড়াজাল থেকে মুক্তির পালা। বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে কারাবন্দি থাকা হাজার হাজার নেতা-কর্মী আজ মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নিচ্ছেন। অনেকে খালাস পেয়েছেন ফরমায়েশি মামলা থেকে। কিন্তু এই উৎসবের আবহেও বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে কুষ্টিয়ার কুমারখালী এলাকার বিএনপি পরিবারে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর কুষ্টিয়া জেলা শাখার উপদেষ্টা ও কুমারখালী পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির বিগত ১৬ বছর ধরে একটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে দুর্বিষহ জীবন পার করছেন। যেখানে হাজারো রাজনৈতিক বন্দী মুক্তি পেয়েছেন, সেখানে কেন এই ত্যাগী নেতা আজও অন্ধকুঠুরিতে? কেন এখনো ঝুলে আছে তার মুক্তির আইনি প্রক্রিয়া? এই প্রশ্ন এখন কুষ্টিয়ার সাধারণ মানুষ ও তৃণমূল বিএনপি নেতা-কর্মীদের মুখে মুখে।
হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে এই মামলার সূত্রপাত হয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের আমলে। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার নীল নকশার অংশ হিসেবে হুমায়ুন কবিরকে একটি হত্যা মামলায় জড়ানো হয়। বিএনপির দাবি অনুযায়ী, এই মামলাটি ছিল সম্পূর্ণ সাজানো এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সাহারা খাতুনের ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা ও প্রশাসনের নগ্ন হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এই মামলায় তাকে অভিযুক্ত করে ফরমায়েশি রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বিগত ১৬ বছর ধরে কারাগারে থাকায় হুমায়ুন কবির কেবল তার যৌবন হারাননি, হারিয়েছেন তার পরিবারের সান্নিধ্য এবং স্বাভাবিক জীবন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন জনপ্রিয় স্থানীয় নেতাকে দমিয়ে রাখতে তৎকালীন সরকার যেভাবে বিচার ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছিল, হুমায়ুন কবিরের মামলাটি তার এক ধ্রুব উদাহরণ।
শীর্ষ নেতাদের উদ্বেগ ও মুক্তির দাবি হুমায়ুন কবিরের দীর্ঘ কারাবাস নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক উপমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আব্দুস সালাম পিন্টু এক বিবৃতিতে বলেন, “আমি অত্যন্ত ব্যথিত চিত্তে লক্ষ্য করছি যে, কুষ্টিয়ার জনপ্রিয় নেতা হুমায়ুন কবির ১৬ বছর ধরে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে কারাবন্দি। এটি অত্যন্ত অমানবিক। সাহারা খাতুনের সরাসরি হস্তক্ষেপে এই মামলাটি সাজানো হয়েছিল। হুমায়ুন কবির একজন সৎ ও আদর্শবান মানুষ। কারাগারে থেকেও তিনি নেতা-কর্মীদের সাহস জুগিয়েছেন। আজ তিনি অসুস্থ, আমরা অবিলম্বে তার মুক্তি দাবি করছি।”
একই সুরে কথা বলেছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমি এবং ছাত্রদলের সাবেক ও বর্তমান কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। তারা সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, হুমায়ুন কবিরের মতো ত্যাগী নেতাকে ছাড়া কুষ্টিয়ার বিএনপি অপূর্ণ।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের আমলে বিরোধী দল দমনের যে নারকীয় উৎসব চলেছিল, হুমায়ুন কবির সেই ষড়যন্ত্রের শিকার। যেখানে জামায়াত নেতা আজহারুল ইসলামসহ অনেকে ন্যায়বিচার পেয়ে মুক্তি পাচ্ছেন, সেখানে হুমায়ুন কবিরের মামলাটি আপিল বিভাগের রিভিউ পর্যায়ে কেন আটকে থাকবে? আমরা বিচার বিভাগের কাছে দ্রুত ন্যায়বিচার ও তার মুক্তি প্রত্যাশা করছি।”
হুমায়ুন কবিরের ছোট ভাই মো. মানিক হোসেন নিজেও রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার। তিনি বলেন, “আমাদের পরিবারকে রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস করতে একের পর এক মামলা দেওয়া হয়েছে। আমার ওপর থেকে মামলার বোঝা কমলেও বড় ভাই আজও ফিরতে পারেননি। ১৬ বছর একটি দীর্ঘ সময়। তিনি ছিলেন আমাদের পরিবারের বটগাছ। আজ তার অনুপস্থিতিতে আমাদের সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। আমরা কি এই স্বাধীন দেশেও ন্যায়বিচার পাব না?”
মেয়ের আকুল আবেদন:
“তারেক রহমান আঙ্কেল, আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিন” হুমায়ুন কবিরের কারাবাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি তার সন্তানরা। ১৬ বছর ধরে বাবার আদর থেকে বঞ্চিত তার মেয়ে এখন বড় হয়েছেন। তার করুণ আকুতি আজ রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয়। বাবার মুক্তির অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকা হুমায়ুন কবিরের মেয়ে বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় নেতা ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে একটি বিশেষ খোলা চিঠি ও ভিডিও বার্তায় বলেছেন।
“শ্রদ্ধেয় তারেক রহমান আঙ্কেল, আসসালামু আলাইকুম। আপনি আজ কোটি কোটি মানুষের আশার আলো। আপনি জানেন দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে আমার বাবা হুমায়ুন কবির অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি। যখন আমি ছোট ছিলাম, তখন বাবাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আজ আমি বড় হয়েছি, কিন্তু আমার বাবার স্নেহ মাখা হাতটি আমার মাথায় নেই। আমার বাবা তো কোনো অপরাধী নন, তিনি শুধু জিয়ার আদর্শকে ভালোবেসেছিলেন বলে তাকে রাজনৈতিকভাবে ফাঁসানো হয়েছে। ৫ই আগস্টের পর ভেবেছিলাম বাবা ফিরে আসবেন। আঙ্কেল, আমার বাবা এখন অনেক অসুস্থ। জেলখানায় তার অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। আপনার কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ, আপনি নিজে বিষয়টি তদারকি করুন। আমরা আমাদের বাবাকে ফিরে পেতে চাই।”
কেন এখনো মুক্তি মেলেনি?
৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর অনেক মামলা প্রত্যাহার করা হলেও হুমায়ুন কবিরের বিষয়টি বর্তমানে একটি জটিল আমলাতান্ত্রিক বেড়াজালে আটকে আছে। যদিও বিষয়টি বর্তমানে দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ আপিল বিভাগের ‘রিভিউ’ পর্যায়ে রয়েছে, তবে এর সমান্তরালে প্রশাসনিকভাবেও তার মুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, হুমায়ুন কবিরের বিষয়টি বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সহযোগিতায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দৃষ্টিতে আসে এবং সরকার তাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আইনি সকল ব্যবস্থা শুরু করে। তাকে মুক্তির লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি ফাইল আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। আইন মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ফাইলটি পুনরায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হয়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ফাইলটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্যাক করার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি নির্দিষ্ট প্রশাসনিক সময় বা পর্যায় শেষ হয়ে যাওয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগেই বিষয়টি পুনরায় ঝুলে যায়। ফলে মুক্তির দোরগোড়ায় পৌঁছেও কারাফটক দিয়ে বের হতে পারেননি এই ত্যাগী নেতা।
তৃণমূল নেতা-কর্মীদের প্রশ্ন, যে বিচারকরা শেখ হাসিনার আজ্ঞাবহ হয়ে ‘ফরমায়েশি রায়’ দিয়েছিলেন, তাদের রায়ের ওপর ভিত্তি করে কেন এখনো একজন ত্যাগী নেতা কারাগারে থাকবেন? বিশেষ করে ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহামুদ জুয়েল এবং ছাত্রদল কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মীর ইমরান হোসেন মিথুন জোর দিয়ে বলেছেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বিচার বিভাগের উচিত এই ধরনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করা। ৫৬৯ ধারার ফাইলটি যেখানে চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল, সেটি কেন আটকে থাকবে?
হুমায়ুন কবির কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি ১৬ বছরের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে টিকে থাকা এক অকুতোভয় সৈনিকের নাম। কারাবন্দি অবস্থায় তার অসুস্থতা এবং পরিবারের চরম দুর্ভোগ আজ মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। কুষ্টিয়ার কুমারখালীর আপামর জনতা এবং বিএনপি পরিবার এখন তাকিয়ে আছে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হস্তক্ষেপের দিকে।
হুমায়ুন কবিরের মেয়ের চোখের পানি আর পরিবারের আর্তনাদ কি পৌঁছাবে ন্যায়বিচারের দরবারে? ১৬ বছরের অন্ধকারের অবসান ঘটিয়ে হুমায়ুন কবির কি ফিরে আসবেন তার প্রিয় সংগঠন আর পরিবারের মাঝে? এই প্রশ্নের উত্তর এখন কেবল সময়ের হাতে। তবে দল ও পরিবারের দাবি, অবিলম্বে যেন ৫৬৯ ধারার ওই ফাইলটির চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে এই ‘মিথ্যা’ সাজা বাতিল করে তাকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং দীর্ঘ ১৬ বছরের অবিচারের অবসান ঘটানো হয়।